শেয়ার বাজারের এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পিছনে এই বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে এবং রাখতে পারে

আজকে বাড়লে, কালকে আবার কমে। কালকে কমলে পরশু আবার বাড়ে। এ যেন তৈলাক্ত বাঁশে উঠানামা। কথাগুলো যেমন মিলে যাচ্চিলো শেয়ার বাজার এবং এর সূচক এর সাথে।

তবে আশার কথা হলো অনেকদিন ধরেই শেয়ার বাজারে মূল্য সূচক বাড়ছে। এর সঙ্গে লেনদেন ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সূচক ও লেনদেনের বড় উত্থানের কারনে বাজার মূলধন আগের থেকে অনেক বেড়েছে। সূচক ও বাজারে মূলধন বাড়ায় ডিএসইতে লেনদেনের গতি যথেষ্ট বেড়েছে।

প্রায় এখন সংবাদ মাধ্যমগুলোতে শেয়ার বাজার নিয়ে ইতিবাচক কলাম প্রকাশিত হচ্ছে। শেয়ার বাজারের এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পিছনের যে বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে এবং রাখতে পারেঃ

• ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণঃ ফ্লোর প্রাইস থাকার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এটিকে নিরাপত্তা হিসেবে দেখছেন। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

• প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোঃ শেয়ারেহোল্ডাররা আশাবাদী হয়ে যেমন শেয়ার কেনেন, আবার ভীত হলে একযোগে শেয়ার বিক্রি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাজার টালমাটাল হয়ে পড়ে। বেচাকেনায় উত্থান-পতনটা হয় অস্বাভাবিক। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের নিয়ন্ত্রণ না নিলে এ অস্বাভাবিক ধারার থাকবেই। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর প্রচেষ্টা গ্রহন করতে হবে এবং সুষ্ঠু বিনিয়োগ ধারা সৃষ্টি করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।
• সমন্বয়হীনতাঃ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং সরকারি অন্যান্য সংস্থার মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা ছিল, তা কমে এসেছে।
• পর্যবেক্ষণঃ বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকে এতদিন বাইরে বসে পর্যবেক্ষণ করছিল। এখন তারাও বাজারে আসতে শুরু করেছে।
• সুদের হার কমে যাওয়াঃ ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদের হার কমার একটা প্রভাব পড়েছে বাজারে।

• শেয়ার বাজার সম্পর্কে ধারনা রাখাঃ বাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় গুজবে ও কানকথা শুনে আকৃষ্ট হয়ে প্রতিদিনই নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন টাকা নিয়ে। দরপতনের ভীতি ছড়িয়ে পড়লে তারাই সবার আগে শেয়ার বিক্রি করেন। তখনই দরপতন ত্বরান্বিত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবাই। শেয়ার বাজার সম্পর্কে সাধারন ধারনা এখন ও অনেকের নেই বললে চলে।

• পর্যাপ্ত তারল্যঃ ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। শেয়ার বাজারেও তারল্যের কোনও সংকট নেই। যে কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
• পদক্ষেপ গ্রহনঃ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন কমিশন বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপে বাজারের ওপর এ আস্থা বাড়ছে। যেমনঃ কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাতিল করেছে। বাজারে এসব তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়াও বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সব মিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।
• সিন্ডিকেট রেটঃ সিন্ডিকেটেড রেট (কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ সিন্ডিকেট করে কোনও কোম্পানির দাম নিজেরা বাড়িয়ে ও কমিয়ে বেচা-কেনা করে) নিয়ন্ত্রণ করলে এক্ষত্রে শেয়ার বাজারে পজিটিভ পরিবর্তন আসবে।
• বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে শেয়ারবাজারে মূল্য সূচকের বড় উত্থান হচ্ছে।
• দরপতনে আতঙ্কিত না হওয়াঃ বড় উত্থানের পর শেয়ারবাজারে টানা দরপতন হতে পারে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

• ২০০ কোটি টাকার তহবিলঃ প্রত্যেক ব্যাংককে শেয়ার বাজারের জন্য ২০০ কোটি টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা এখন ছাড় হচ্ছে। অর্থাৎ এই টাকা পুঁজিবাজারে আস্তে আস্তে আসছে। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

• ৫% সার্কিট ব্রেকারঃ লোয়ার প্রাইসে লাগানো হয়েছে ৫% সার্কিট ব্রেকার। অর্থাৎ, এখন কোন শেয়ার একদিনে ৫% এর বেশি কমতে পারবে না আর বাড়তে পারবে আগের মতোই ১০%৷ আর এই আইন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি।
• পরিচালকদের শেয়ারঃ পরিচালকদের নামেমাত্র শেয়ার না থেকে একটা বড় অঙ্কের শেয়ার থাকা উচিত। কারন নামে মাত্র শেয়ার থাকলে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ থাকবে না আর লভ্যাংশ ও ভালো দিবেনা এটাই স্বাভাবিক। তাই যেসব কোম্পানির শেয়ার পরিচালকদের হাতে নাই তাদের কে বাই ব্যাক আইন করে শেয়ার কিনতে বলা যেতে পারে।

অন্যান্য কিছু বিষয়ঃ

১) শেয়ার বাজার শব্দটির উত্থানঃ

ইউরোপে শিল্প বিল্পবের সূচনা লগ্নেই শেয়ার বাজারের উৎপত্তি। ইউরোপের কৃষিজীবী মানুষেরা যখন শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন শেয়ার প্রসঙ্গটির সূচনা হয়। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠায় অনেক টাকার প্রয়োজন হয়, যাহা একজন ব্যক্তির পক্ষে যোগান দেয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যৌথমালিকানার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অনেক ব্যক্তি মিলে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অনেক অংশীদারিত্ব সৃষ্টি হয়। এক একটি অংশীদারিত্ব মানেই এক একটি শেয়ার।
২) কেন শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ঃ মনে করুন একটি শেয়ারের আসল মূল্য ১০০ টাকা। ৪র্থ বারের মত হাত বদল হয়ে দাম হলো ২০০ টাকা। এই পর্যায়ে যদি শেয়ারের দাম আর না বাড়ে তখন শেষের ব্যক্তি সরাসরি ক্ষতির মুখোমুখি হল। শেয়ারটির দাম দ্বিগুণ হবার পিছনে কারণটা হচ্ছে কারসাজি আর কিছু লোক না বুঝে হুজুগে লাভের আশায় শেয়ারটি কিনেছে। তাছাড়া একটি পক্ষ নিজেরাই এই শেয়ারটির দাম বাড়িয়েছে এবং নিজেদের লোকেরাই তা কিনেছে। এভাবে দাম বাড়িয়ে তা শেষোক্ত ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে নিজেরা সটকে পড়েছে। এতে কোম্পানির কোন মূলধনও বাড়েনি এবং দেশের অর্থনীতিরও কোন উপকার হয়নি। শেয়ারটির দাম দ্বিগুণ হলেও, কোম্পানির মূলধন কিন্তু ১০০ টাকাই রয়ে গেছে। শেয়ার বাজারে যারা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন তারা সবাই কিন্তু শেষোক্ত শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত। দাম না বাড়ার কারণে সেই শেয়ার আর বিক্রি করতে পারছে না। ফলে তারা ক্ষতির সম্মুখীন। এ অবস্থায় তারা মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসতেও পারছে না।
৩) মূলধন কিভাবে সংগ্রহ করেঃ কোম্পানির মূলধন হিসেবে টাকা প্রয়োজন। এক্ষত্রে ব্যাংক থেকে নিতে পারে। তখন জামানত হিসেবে জমি কিংবা অন্য জিনিস বন্ধক রাখতে হবে। এবং সুদ ত আছেই। কোম্পানিটি বিকল্প হিসেবে শেয়ার বাজারথেকে টাকা নিতে পারে শেয়ার বিক্রি করে। এক্ষেত্রে বছরে যদি সুদের চেয়ে কম লভ্যাংশ দেয় তাহলে বরং তাদের আরো লাভ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি লোকসানে পড়লে ব্যাংক থেকে সম্পত্তি ক্রোকের সম্ভাবনা আছে যেটা শেয়ার বাজারের ক্ষেত্রে নেই।

শেয়ার বাজার একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অর্থনৈতিক চিত্রকে প্রতিফলিত করে। তাই দেশের উন্নতির স্বার্থেই শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা, নীতিমালা এবং গাইডলাইন।