এবার আউশ ধান চাষে ব্যাপক আগ্রহ কৃষকের

Planting-aus-paddy-seedling

>> উৎপাদনে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে
>> ১৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ
>> উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টন

বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়া, সরকারের পক্ষ থেকে সার, বীজ ও সেচ সুবিধা পাওয়ার কারণে এবার কৃষকরা আউশ চাষের দিকে ঝুঁকছেন। বোরো কাটার পরপরই অনেক কৃষক আউশ ধান রোপণ করেছেন।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ও বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের কথা বিবেচনা করে খাদ্য উৎপাদনে সরকারের পক্ষ থেকে জোর দেয়া হয়েছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হলেও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টন। গত অর্থবছরের চেয়ে এবার আউশ উৎপাদন সাড়ে ৭ লাখ টন বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। ফলে এবার লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে।

বিভিন্ন জেলার কৃষকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, গত দুই বছর ধরে ধানের দাম খরচের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে ধান চাষে অনেকে বিমুখ ছিলেন। ধানের পরিবর্তে তারা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ইউএসডিএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে ১১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলেও ১০ লাখ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করেন কৃষকেরা। আগের অর্থবছর (২০১৮-১৯) আউশ আবাদের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। ফলে দেড়লাখ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ কমেছে।

এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ‘২০১৯-২০ মৌসুমে আউশ ধানের উৎপাদন ৩ লাখ টন কমে যাচ্ছে।’

প্রকৃতপক্ষেই এই অর্থবছরে অনেক কৃষক আউশ ধান উৎপাদন না করায় সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার উল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক হেলাল খাঁ জানান, এবার ৫ বিঘা জমিতে আউশ ধান রোপণ করেছেন। গত মৌসুমে তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করে ভালো পান। প্রতিমণ ধান তিনি এক হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন। বোরো ধানে ভালো লাভ পেয়ে এবার আউশ ধান চাষে তার আগ্রহ বেড়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা শুনেছি যে, সরকার আউশ চাষিদের বীজ, সার, সেচ সুবিধা দিচ্ছে, কিন্ত আমার আশপাশের কোনো কৃষক এ সুবিধা পেয়েছে বলে শুনিনি এবং আমিও পাইনি। ধুনটের কোনো কৃষি কর্মকর্তাও এ পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেননি। আমরা নিজেরাই আউশ ধানের আবাদ বেছে নিয়েছি। বোরো ধানের ভালো দাম পেয়েছি তাই আউশ ধান আবাদ করছি। এই আউশ ধান কেটে আগাম ভুট্টা লাগানো যাবে। ভুট্টা ধানের চেয়ে লাভজনক ফসল।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জের রামজীবন ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আজিজ জানান, কৃষি বিভাগের সহায়তায় এ বছর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আউশ ধান রোপণ করেছি। আউশ ধান আবাদে উৎপাদন খরচ কম। পানি সেচ দেয়ার দরকার হয় না। সেই সাথে কিটনাশক ও স্যার প্রয়োগ করতে হয় সীমিত। তাছাড়া এবার বোরো ধানের ভালো দাম পেয়ে আউশ ধান উৎপাদনের উৎসাহ-উদ্দীপনা আরও বেড়ে গেছে। ধানের দাম এভাবে থাকলে আগামী বছর আরও বেশি করে চাষ করবেন বলে জানান তিনি।

এই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রেজা-ই মাহমুদ বলেন, আমরা আউশ ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে ৯০০ জনকে প্রণোদনা দিয়েছি। গত বছরের তুলনায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধান রোপণ বাড়ানো হয়েছে, যা আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েছে আউশ ধান আবাদে। চলতি বছর এ উপজেলা আউশ ধান রোপণে সারাদেশে তৃতীয় ও উত্তরাঞ্চলে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।

Planting-aus-paddy-seedling

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. শাহজাহান কবীর জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘এক ইঞ্চি জমি ফেলে রাখা যাবে না। প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগাতে হবে।’ তার এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আমরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। সরকারের পক্ষ থেকে বীজ, সার ফ্রি দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেখানে সরকারি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থা আছে সেখানে সেচও ফ্রি করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এবার বোরো ধানের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষক আউশ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হচ্ছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টন। কৃষকের যে আগ্রহ তাতে জমি ও উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। বরিশালে যেসব জমি পতিত থাকত, কোনো আবাদ হত না, এবার সেসব জমি আবাদের আওতায় এসেছে। করোনাসহ যে কোনো মহামারি হলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। আমাদের দেশে যেন কোনো খাদ্য সংকট না হয়, সেজন্য ধানের উৎপাদন আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, আমরা সে চেষ্টা করছি। কৃষককেও নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। গত অর্থবছরের চেয়ে এবার আউশ ধানের উৎপাদন অনেক গুণ বাড়বে।’

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) কৃষিবিদ ড. মো. আলহাজ উদ্দিন এক প্রশ্নের জবাবে জাগো নিউজকে বলেন, প্রথম দফায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৪ জন ও দ্বিতীয় দফায় ৮২ হাজার ৪০০ জন কৃষকসহ মোট ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩৪ জন কৃষককে আউশ চাষে প্রণোদনা ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এসব কৃষককে বীজ ও সার ফ্রি দেয়ার কারণে আউশ চাষে তাদের আগ্রহ বেড়েছে।

তিনি বলেন, আমরা কৃষককে ভালো জাতের বীজ, যার অধিক ফলন হয়, সেসব বীজ দিচ্ছি। এসব বীজে অধিক উৎপাদন হবে। আর অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক লাভবান হলে পরবর্তীতে অউশ ধান চাষে কৃষককে আর বলতে হবে না। নিজের প্রয়োজনেই কৃষক আউশ ধান চাষ করবে।

এফএইচএস/জেডএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন – [email protected]

.